
ক্রাইস্টচার্চের লিনউড ইসলামিক সেন্টারের আল-নূর মসজিদে হামলাকারীর উপযুক্ত বিচার বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্নার্ড বলেছেন, ‘বেঁচে যাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্থদের পরিবারগুলোর পক্ষে এটি একটি কঠিন সপ্তাহ। তিনি বলেন – “আমি মনে করি এবং বুঝতে পারি যে তাদের জন্য এই সময়টি কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে। এবে একটি উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে তাদের এই বেদনাহত সময় একটি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সময়ে পরিণত হতে পারে।”
এর আগে গত বছর এই ভয়ানক হামলার পরপরই তিনি এই সন্ত্রাসীর নাম মুখে না বলার শপথ করেছিলেন এবং এখন পর্যন্ত তিনি এই সন্ত্রাসীর নাম মুখে নেননি।”
অপরদিকে এই ঘটনার এক মাসেরও কম সময় পরে নিউজিল্যান্ডের সংসদে সামরিক ধাঁচের আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো।
বিচারিক প্রক্রিয়া :
জানা যায় – ক্রাইস্টচার্চে হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারেন্টের চার দিন স্থায়ী হওয়া এই সাজা শুনানি সোমবার সকালে ক্রাইস্টচার্চে শুরু হয়েছিল। কোভিড -১৯ এর কারণে মূল আদালতের ঘর তুলনামূলকভাবে খালি রয়েছে। তবে সামাজিক দূরত্বের ব্যবস্থা গ্রহণ করে জন্য শহরের অন্যান্য আরো বেশ কয়েকটি কোর্টরুম থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শত শত মানুষ এই বিচারিক প্রক্রিয়া দেখেছেন।
যে আদালতে বিচার হচ্ছে সন্ত্রাসী ট্যারেন্টের :
খৃস্টান জঙ্গী ব্রেন্টন ট্যারান্ট ধূসর রংয়ের কারাগারের পোশাক পরে তিনজন অস্ত্রধারী পুলিশের বেষ্টনিতে একটি কাচের ঘের দেওয়া রুমে বসেছিলেন। তাকে বেশিরভাগ সময়ই নির্লিপ্ত দেখা গেছে। তবে মাঝে মাঝে এই সন্ত্রাসী তার নির্মম গণহত্যার শিকার শহীদ পরিবারগুলো যে রুমে বসে ছিলো সেখানে তাঁকাচ্ছিলেন।
আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর বার্নার্ব হাউস আদালতকে বলেছিলেন যে এই সন্ত্রাসী বন্দুকধারী কয়েক বছর আগে থেকেই ‘মসজিদে হামলার’ পরিকল্পনা প্রণয়ন শুরু করেছিলো এবং তার লক্ষ্য ছিল “যতটা সম্ভব প্রাণহানির ঘটনা ঘটানো”।
তিনি নিউজিল্যান্ডের মসজিদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন – মসজিদের অবস্থানসহ আরও বিশদভাবে সে এ বিষয়ে যাচাই করে নিয়েছিলো।হামলার আগের কয়েক মাস তিনি ক্রাইস্টচার্ট ভ্রমণ করেছিলেন এবং অনুসন্ধানের জন্য তার প্রাথমিক লক্ষ্য অনুসারে আল নূর মসজিদের উপরে একটি ড্রোন উড়িয়েছিলেন।
ব্রেন্টন আল নূর মসজিদ এবং লিনউড ইসলামিক সেন্টার ছাড়াও অ্যাশবার্টন মসজিদকেও টার্গেট করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তৃতীয় মসজিদে যাওয়ার পথে তাকে আটক করা হয়েছিল। আক্রমণের দিন, তিনি আল নূর মসজিদ থেকে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে লোকজনকেও রাস্তায় গুলি করেছিলেন। এর মধ্যে আন্সি আলিবাভা নামে এক ভুক্তভোগী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
লিনউড ইসলামিক সেন্টারের দিকে যাওয়ার সময় তিনি থামলেন এবং পালাতে সক্ষম হওয়া আফ্রিকান বংশোদ্ভূত লোকদের দিকে গুলি করলেন। গ্রেপ্তারের পরে তিনি পুলিশকে বলেছিলেন যে তার পরিকল্পনা ছিল হামলার পরে মসজিদগুলি পুড়িয়ে ফেলার, এবং তিনি ইচ্ছা করেছিলেন যে তিনি এটি করবেনই।
সন্ত্রাসী ট্যারান্ট আদালতে নিজেই নিজের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি এর আগে তার উপর আরোপিত অভিযোগগুলি অস্বীকার করেছিলেন এবং গত জুন মাস থেকে বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তখন তার আবেদন ছিলো – তিনি সর্বনিম্ন ১ বছরের বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হবেন। তবে হাইকোর্টের বিচারপতি বিচারপতি ‘ক্যামেরন মান্ডার’ তাকে প্যারোলবিহীন আজীবন কারাদন্ড দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তবে এটি এমন একটি শাস্তি যা নিউজিল্যান্ডে আগে কখনও কাউকে দেওয়া হয়নি।
এদিকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডার্ন বলেছেন, বেঁচে যাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্থদের পরিবারগুলোর পক্ষে এটি একটি কঠিন সপ্তাহ হবে। তিনি বলেন – “আমি মনে করি এবং বুঝতে পারি যে তাদের জন্য এই সময়টি কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে। এবে একটি উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে তাদের এই বেদনাহত সময় একটি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সময়ে পরিণত হতে পারে।”
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা। যিনি আল-নূর মসজিদে ভয়াবহ গণহত্যার পর মুসলমানদের পাশে দাড়িয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। ছবি : রয়টার্স।
এর আগে গত বছর এই ভয়ানক হামলার পরপরই তিনি এই সন্ত্রাসীর নাম মুখে না বলার শপথ করেছিলেন এবং এখন পর্যন্ত তিনি এই সন্ত্রাসীর নাম মুখে নেননি।” অপরদিকে এই ঘটনার এক মাসেরও কম সময় পরে নিউজিল্যান্ডের সংসদে সামরিক ধাঁচের আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো।
প্রসঙ্গত : ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ শুক্রবার লিনউড ইসলামিক সেন্টারে জুমার নামাজ চলাকালে অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার করে নির্মম এ হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যা চালান ২৯ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক শ্বেতাঙ্গ জঙ্গী ও সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে তাঁর সাজা ঘোষণা করা হবে। ক্রাইস্টচার্চের ওই ঘটনায় বিশ্ববাসী শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
লিনউড ইসলামিক সেন্টারের আল নূর মসজিদ। ছবি : ওয়াশিংটন পোস্ট।
সে প্রথমে আল নূর মসজিদে যান এবং শুক্রবারের নামাজে অংশ নেওয়া লোকদের উপর গুলি চালান। এরপরে তিনি লিনউড মসজিদে প্রায় ৫ কিলোমিটার (৩ মাইল) গাড়ি চালিয়ে আরও লোককে হত্যা করেন। যেখানে তিনি ৫১টি হত্যা, ৪০টি হত্যাচেষ্টা ও একটি সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ড করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন আদালতে। আগামী কাল তার এই নারকীয় গণহত্যার বিচারিক রায় প্রকাশ করা হবে।
গত সোমবার (২৩ আগস্ট) থেকে চলমান এ বিচারিক আদালতের কার্যক্রম শেষ হবে আগামী কাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট)। ধারণা করা হচ্ছে – কাল বৃহস্পতিবার ক্রাইস্টচার্চের এই আদালতে তাকে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন সাজা প্রদানের পরে অস্ট্রেলিয়ান অধিবাসী এই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ট্যারান্ট নিউজিল্যান্ডের প্রথম ব্যক্তি হয়ে প্যারোলের সম্ভাবনা ছাড়াই যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন।
১৯৬১ সালে নিউজিল্যান্ডে শাস্তিস্বরুপ ‘মৃত্যুদণ্ড’ বাতিল করে দেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে কঠোর শাস্তি হতে পারে এটি। কারণ নিউজিল্যান্ডে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন সাজার ইতিহাস নেই এর আগে। ব্রেন্টন ট্যারেন্টকে সেই শাস্তি দেয়া হতে পারে বলেই সবার ধারণা। তবে তিনি মৃত্যুদণ্ড পেলে ন্যায়বিচার আরও প্রশ্নাতিত হতো বলেই ধারণা অনেকের।
এছাড়াও তিনদিনের বিচারিক কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬০ জনেরও বেশি লোক তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। যেখানে শহীদদের পরিবার এবং আহতরা কথা বলেছেন। ভুক্তভোগীদের কিছু আত্মীয় বিদেশ থেকে ভ্রমণ করে এসেছিলেন এবং এই বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদেরকে দুই সপ্তাহের কোয়ারান্টিনেও থাকতে হয়েছিলো করোনাভাইরাস থেকে নিশ্চয়তার জন্য।
এদিকে আদালতে একে একে প্রায় সকল শহীদ পরিবারের ভাষ্য শোনা হয়েছে। সেখানে পরিবারগুলোর ভাষ্য ও আহতদের কথা শুনে অশ্রুসজল হয়েছেন সবাই।
ব্রেন্টন ট্যারেন্টের বিচারিক রায় বিষয়ে বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন
উগ্রবাদী সন্ত্রাসী কর্তৃক ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর মসজিদে হামলার এক বছর ও বিস্তারিত ঘটনা

