
রামগঞ্জে একই পরিবারের ১১জন হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়ার ঘটনায় আটক ১১জনকে ভারতে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন, লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশের এসপি এ এইচ এম কামরুজ্জামান।
রোববার রাতে তিনি সাংবাদিকদের জানান, তাদের কাছে ভারতীয় বৈধ পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে তারা বাংলাদেশে এসেছিলো। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ো যাওয়ার পরও বাংলাদেশে রয়ে গেছে, এজন্য তাদের আটক করা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদেরকে ফেরত পাঠানো হবে।
এসপি এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, মনির হোসেন নামে যিনি ধর্মান্তরিত হয়েছেন তার কাছে আমরা ভারতীয় বৈধ পাসপোর্ট পেয়েছি, যাতে তার নাম শঙ্কর অধিকারী। তার সাথে অন্য যারা আছেন তাদের কয়েকজনরও বৈধ ভারতীয় পাসপোর্ট আছে। তারা গত বছরের ১৪ আগস্ট ২ মাসের ভিসা নিয়ে বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে গত ডিসেম্বর মাসে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে জন্ম নিবন্ধন সনদ করা হয়েছে।
এসপি আরো জানান, বর্তমানে তাদেরকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গ্রেফতার করে থানায় রাখা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে ভারতে ফেরত পাঠানো হবে।
প্রসঙ্গ, রামগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর পাটোয়ারীর বাড়িতে শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) রাতে আয়োজিত তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে মাওলানা মিজানুর রহমান আযহারীর কাছে হিন্দু পরিচয়ে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হন একই পরিবারের ১১জন। কিন্তু অভিযোগ ওঠে তারা আগে থেকেই মুসলিম ছিলেন, মাহফিলে কেবলমাত্র পরিচয় গোপন করে হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়ার নাকট মঞ্চায়ন করা হয়েছে।
পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের পূর্ব থেকে মুসলিম পরিচয়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়। শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। শনিবার এ ঘটনা রামগঞ্জে ‘টক অব দ্য টাউনে’ পরিণত হয়। এ ঘটনায় ওই পরিবারের সবাইকে শনিবার রাতেই থানা হেফাজতে নেয় পুলিশ।
এ ব্যাপারে মাহফিল পরিচালনা কমিটির আহবায়ক ও রায়পুর এল এম হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তারা যে আগে থেকেই মুসলমান ছিল এ বিষয়ে আমাদের জানা ছিল না। মাহফিলের শেষে বিষয়টি আলোচনা আসার পরে বিস্মিত হয়েছি। পুলিশ ওদের আটক করে হেফাজতে রেখেছে। বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে। এই মুহুর্তে আমি বেশি কিছু বলতে পারবো না’।
উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টন ঐক্য পরিষদের সভাপতি অপুর্ব কুমার সাহা বলেন, ‘তার মা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মেম্বার, সন্তানেরা মাদরাসাতে পড়ে, বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন মুসলিম পরিচয়ে মুসলিম ছেলের সাথে, জম্ম নিবনন্ধনে সবার পরিচয় মুসলমান হওয়ার পরেও কীভাবে মাহফিলে গিয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান ধর্ম গ্রহন করে। এটি নাটক ছাড়া কিছুই নয়’।
রামগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর ১১জনকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। বিষয়টি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ায় নেওয়া হবে।
মনির হোসেন ওরফে শঙ্কর অধিকারীর মা ফাতেমা মেম্বার জানান, ৩০/৩৫ বছর আগে তার ছেলে মনির হোসেনের বয়স যখন ১২/১৪ বছর ছিল তখন ঢাকার টঙ্গী এলাকায় তার খালার (ফাতেমার বোন হালিমা) কাছে থাকতো। ওইসময় সে ঝালমুড়ি বিক্রি করতো। বিশ্ব ইজতেমায় একদিন মুড়ি বিক্রির সময় মনির হারিয়ে যায়। এরপরে আর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বহু বছর পর পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে ফাতেমার পরিবার জানতে পারে মনির হোসেন কলকাতায় থাকেন, এবং শঙ্কর অধিকারী নাম গ্রহণ করেছেন। এরপর কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে আসেন মনির এবং জানান তিনি ভারতে বিয়ে শাদি করেছেন, তার সন্তান আছে।
এ বিষয়ে ফাতেমা মেম্বারের ছেলে ও মনিরের ছোট ভাই জহির উদ্দিন জানান, মনিরের সন্ধান পাওয়া যায় ২০১৬ সালে। তখন তিনি একা বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং চেষ্টা করছিলেন কলকাতায় থাকা তার সন্তানসহ পরিবারকে নিয়ে একেবারে বাংলাদেশে চলে আসতে।
২০১৬ সালে বড় ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ হওয়ার বিষয়ে জহির বলেন, ‘আমরা তখন জানতে পারি সে হিন্দু হয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়ার পর ও বাড়ি ঘরের ঠিকানা কাউকে বলতে পারেনি। বাংলাদেশ থেকে কারো মাধ্যমে ভারতে চলে গিয়েছিল। প্রথমে কলকাতায় একটি বন্দীখানায় ছিলো। তারপর সেখান থেকে ছাড়া পেলেও দেশে আসতে পারেনি। কলকাতায় থাকতে গিয়ে লোকজনের কাছে হিন্দু পরিচয় দেয়। এরপর এক হিন্দু মেয়েক বিয়ে করে। তার ঘরে সন্তানও হয়। পরে আরেকজনকেও বিয়ে করে। দুই ঘরে তার ছেলে মেয়ে আছে মোট ৮ জন। আমরা যখন (২০১৬ সালে মনির বাড়িতে আসার পর) জানলাম সে হিন্দু হয়ে গেছে তখন দুইদিনের বেশি আমাদের বাড়িতে তাকে থাকতে দেইনি। ও চলে গেছিল আবার কলকাতায়’।
রোববার জহির উদ্দিন বলেন, ‘৬/৭ মাস আগে (২০১৯ সালে) পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমার ভাই দেশে চলে আসে, এবং আত্মীয়দেরকে জানায় তার স্ত্রী-সন্তানদের সবাইকে নিয়ে মুসলমান হয়ে যাবে। এতে আমরা খুশি হই এবং তাদেরকে মেনে নিই’।
সংশ্লিষ্ট খবর:
রামগঞ্জে আযহারীর মাহফিলে ১১জনের ইসলাম গ্রহণের নেপথ্য কাহিনী!
/এসএস

