
রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বরগুনা জেলা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে বরগুনা পৌরসভার মাইট এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। মিন্নির বাবাও সঙ্গে ছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে খুনে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার করে বরগুনা পুলিশ।গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯ টায় মিন্নিকে গ্রেফতার করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বরগুনা পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন।
পুলিশ সুপার বলেন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ১ নম্বর সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শী মিন্নি। তার বক্তব্য রেকর্ড ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বরগুনা পুলিশ লাইনে আনা হয়। রাতে তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তার কথাবার্তায় সন্দেহ হয় পুলিশের।
মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানোর পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন পুলিশ সুপার। সেখানে বলেন, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে ও অন্যান্য সোর্স থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তাই রাত ৯টার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আলোচিত রিফাত রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কারণ ও আক্রোশের জন্য এই রোমমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নি সরাসরি সম্পৃক্ত। এজন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার সংবাদ মাধ্যমকে জানান, রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত এক অভিযুক্তকে শনাক্ত করার জন্য মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ কার্যালয়ে আনা হয়। শনাক্তকরণ শেষে মিন্নিকে আবার বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
হেফাজতে নেওয়ার পর বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, মামলার মূল রহস্য উদঞঘাটনের ও সুষ্ঠ তদন্তের জন্য এ মামলার ১নং সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি (২০) কে আজ মঙ্গলবার সকালে জবানবন্দির জন্য পরিবারের সদস্যসহ ডেকে আনা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।

তিনি আর বলেন, আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, গত ২৬ জুন চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলারয় পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এক পর্যন্ত এজাহারনামীর ৭ জন যার মধ্যে ৬জন জীবিত ও তদন্ত প্রাপ্ত ৭ জনসহ মোট ১৪ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে।
এর আগে গত রোববার বন্দুকযুদ্ধে নিহত রিফাত হত্যার প্রধান আসামী নয়ন বন্ডের মা এবং নিহত রিফাতের বাবার বক্তব্য নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়। নয়ন বন্ডের মা দাবি করেন মিন্নি নিয়মিত তাদের বাসায় যাতায়াত করতো। নিহত রিফাতের বাবাও দাবি করেন মিন্নিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য।
এসব নিয়ে নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এই মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তার শশুর তথা রিফাতের বাবাকে কেউ ব্যবহার করছে। এছাড়াও তিনি লিখিত বক্তব্যে আরও কিছু দাবি করেন।
এর আগে গত শনিবার রাতে বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন নিহত রিফাতের বাবা ও মিন্নির শ্বশুর দুলাল শরীফ। একই বোরবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বরগুনা প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে বরগুনার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারেবরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে শ্বশুর দুলাল শরীফ বলেন, ‘আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আগে নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেছিল। ওই বিয়ে গোপন করে রিফাত শরীফকে বিয়ে করে মিন্নি। বিষয়টি আমাদের জানায়নি মিন্নি এবং তার পরিবার।কাজেই রিফাত শরীফ হত্যার পেছনে মিন্নির হাত রয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনলে সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
এর আগে বরগুনার রিফাত শরীফ ও আয়েশা আক্তারের বিবাহ হয় প্রায় আড়াই মাস আগে। এক তরুণ ( নয়ন বন্ড) বিয়ের পর পরই দাবি করে সদ্য বিবাহিত আয়েশা আক্তার তার সাবেক স্ত্রী। এ নিয়ে ঐ তরুণ ও আয়েশার স্বামীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে আয়েশাকে বউ হিসেবে দাবি করা নয়ন বন্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি পোস্ট করেন। বাড়ে রিফাতের সঙ্গে নয়নের দ্বন্দ্ব। আয়েশাকে উত্ত্যক্ত করার কারণে রিফাত তাকে কলেজে নিয়ে যেত।
দ্বন্দ্বের জেরে বুধবার (২৬ জুন) সকালে নয়ন তার দুই সহযোগীকে নিয়ে রিফাতের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। আশেপাশে মানুষ থাকলেও রিফাতকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার। আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও হামলা থেকে স্বামীকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি। নৃশংস হামলায় নিহত হন রিফাত শরীফ (২২)। ২৭ জুন বুধবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০ টার দিকে বরগুনার কলেজ সড়কের ক্যলিক্স কিন্ডার গার্টেনের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে।
হামলার ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নিহত রিফাত শরীফ সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের দুলাল শরীফের ছেলে। জানা যায়, বুধবার সকালে সাড়ে ১০ টার দিকে রিফাত তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকাকে বরগুনা সরকারি কলেজে নিয়ে যান। কলেজ থেকে ফেরার পথে মূল ফটকের সামনে নয়ন, রিফাত ফরাজীসহ আরও দুই যুবক অতর্কিতে রিফাতের ওপর হামলা চালায় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়েএলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে।

রিফাতের স্ত্রী আয়েশা দুর্বৃত্তদের থামানোর চেষ্টা করলেও কিছুতেই হামলাকারীদের থামতে পারেননি। তারা রিফাতকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন ও আয়েশা রিফাতকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। জানা যাছে, রিফাতের বুকে, ঘাড়ে ও পিঠে গুরুতর আঘাত থাকায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
বরিশাল শের-ই-বাংলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন রিফাত। ২৮ জুন বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দফায় দফায় এ হত্যা মামলায় ১৪ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর এবার গ্রেফতার করা হল রিফাতের নিজ স্ত্রী মিন্নিকে। খুনের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইসমাঈল আযহার/পাবলিক ভয়েস